,
সংবাদ শিরোনাম :

রাবির ইতিকথা—-শিরিনা আক্তার লিমা

প্রাচ্যের কেমব্রিজ নামে খ্যাত সবুজে ঘেরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম ও পথচলা শুরু হবার পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং সেই সাথে রয়েছে অনেক মহান ব্যক্তিবর্গের সীমাহীন ত্যাগ, পরিশ্রম ও মহানুভবতার বিরল দৃষ্টান্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ইট পাথর এমনকি প্রতিটা অঙ্গন যেন ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে আছে।

ব্রিটিশ যুগে রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষাদীক্ষা উন্নয়নের জন্য ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী কলেজ৷ সে সময়ে রাজশাহী কলেজে আইন বিভাগসহ পোস্ট গ্রাজুয়েট শ্রেণী চালু করা হয়৷ কিন্ত এর কিছুদিন পরেই বন্ধ হয়ে যায় এসব কার্যক্রম৷ সে সময়েই রাজশাহীতে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন অনুভূত হয়৷ ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার দেশের সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে৷ রাজশাহীতে এ সময় স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়৷
ভাষা আন্দোলনের কিছুদিন আগ থেকেই মূলত রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়৷ ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের নিয়ে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়৷ রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য সর্বপ্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী শহরের ভুবন মোহন পার্কে ৷ প্রথম দাবি অবশ্য ওঠে রাজশাহী কলেজেই৷ ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গনে সমবেত হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাস করার দাবি তোলে৷
পরবর্তীতে ১৩ই ফেব্রুয়ারি ভূবন মোহন পার্কেই আলহাজ্ব আব্দুল হামিদ এমএলএ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় আরও একটি জনসভা৷ উক্ত সভায় বক্তব্য রাখেন ইদ্রিস আহমেদ এমএলএ, প্রভাষ চন্দ্র লাহিড়ী, খোরশেদ আলম, আনসার আলী, আব্দুল জব্বার প্রমূখ৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমেই তীব্র হতে থাকে৷ এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে গিয়ে কারারুদ্ধ হন ১৫ ছাত্রনেতা ৷ পরে ছাত্রজনতার পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি ডেলিগেশন পাঠানো হয়৷ ওই ডেলিগেশনের সদস্যদের মধ্যে মরহুম আবুল কালাম চৌধুরী ও আব্দুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য৷ এভাবে একের পর এক আন্দালনের চাপে স্থানীয় আইন পরিষদ রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়৷ এই আন্দোলনে একাত্ব হন পূর্ববঙ্গীয় আইনসভার সদস্য প্রখ্যাত আইনজীবী মাদার বখশ৷
১৯৫৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ভুবন মোহন পার্কে আরও একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মাদার বখশ সরকারকে হুশিয়ার করে বলেন, যদি রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না হয় তবে উত্তরবঙ্গকে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ দাবি করতে আমরা বাধ্য হব৷ মাদার বখশের এই বক্তব্যে সাড়া পড়ে দেশের সুধী মহলে এবং সাথে সাথে টনক নড়ে সরকারেরও৷ অবশেষে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাশ হয়। নতুন উপাচার্য প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরীকেসঙ্গে নিয়ে মাদারবখশ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পরিকল্পনা প্রণয়ন করে৷ এ দুজনকে যুগ্ম সম্পাদক করে মোট ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়৷ এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তত্কালীন বিভাগীয় কমিশনার এম এ খুরশীদ৷ একই বছর ৬ জুলাই প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরীকে উপাচার্য নিয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করে।

শুরুতে ১৬১ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা , ইংলিশ, ইতিহাস, আইন , দর্শন ও অর্থিনীতি বিভাগ নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম ক্লাস শুরু হয় রাজশাহী কলেজে৷ উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দফতর প্রতিষ্ঠা করা হয় পদ্মার তীরের বড়কুঠি নামে পরিচিত ঐতিহাসিক রেশম কুঠি বা নীল কুঠির উপর তলায়৷ বড়কুঠির কাছেই তত্কালীন ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমিতে চিকিত্সাকেন্দ্র ও পাঠাগার তেরি করা হয়৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দফতর স্থাপন করা হয় জমিদার কুঞ্জমোহন মৈত্রের বাড়িতে৷ বড়কুঠি পাড়ার মাতৃধাম এ স্থাপন করা হয় কলেজ পরিদর্শক দফতর৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন ওসমান গনি ও প্রথম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিযুক্ত হন অধ্যাপক আব্দুল করিম৷ শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া করা বাড়িতে গড়ে ওঠে ছাত্রাবাস৷ রাজশাহী কলেজ সংলগ্ন ফুলার হোস্টেলকে রুপান্তরিত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস হিসেবে৷ বড়কুঠি এলাকার লালকুঠি ভবন ও আরেকটি ভাড়া করা ভবনে ছাত্রী নিবাস স্থাপন করা হয়৷
১৯৫৮ সালে বর্তমান ক্যাম্পাসে দালান-কোঠা ও রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হয়।সমস্ত ক্যাম্পাসটি তৈরি হয় অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ানী টমাসের সুনিপুণ স্থাপত্য পরিকল্পনায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয় মতিহারের নিজস্ব ক্যাম্পাসে এবং ১৯৬৪ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অফিস ও বিভাগ এখানে স্থানান্তরিত হয়৷

৭৫৩ একর (৩০৪ হেক্টর) যায়গা জুড়ে বিস্তৃত ক্যাম্পাসে বর্তমানে সর্বমোট ১০ টি অনুষদের অধিনে রয়েছে ৫৯ টি বিভাগ এবং অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪১ টি,যার মধ্যে সরকারি ১১ এবং বেসরকারি ২৪ টি। উচ্চতর গবেষনা ইন্সটিটিউট রয়েছে ৫ টি। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানষিক যেকোন ব্যাপারে সাপোর্ট দেবার জন্য রয়েছে মনোবিঙ্গান বিভাগের অভিঙ্গ শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত মানষিক স্বাস্হ্য কেন্দ্র। যেখানে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত অভিঙ্গ মনোবিঙ্গানীদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের বিনামুল্যে কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১৭ টি । যার মধ্যে ১১ টি ছেলেদের জন্য ও ৬ টি মেয়েদের জন্য।এছাড়াও একটি আন্তর্জাতিক মানের ডরমেটরি রয়েছে।ডিসেম্বর ২০১৫ এর তথ্যসূত্র অনুযয়ী ২৬৪৯৫ জন শিক্ষার্থী ঘেরা ক্যাম্পাসে প্রাধ্যক্ষ ১৭ জন এবং ডীন ৯ জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক হিসেবে রয়েছে উন্মুক্ত গ্রন্হ ও আকাশ দৃষ্টি সম্বলিত শাপলা ফুল ঘেরা একটি বৃত্ত।যার মুল নকশা করেছিলেন শিল্পি গোলাম সারোওয়ার এবং পরবর্তীতে কিছুটা পরিবর্তন করে বর্তমান প্রতিকে রুপ দেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং শিল্পি হাসেম খান।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অঙ্গনে সাবাশ বাংলাদেশ, বদ্ধভূমি ম্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার কমপ্লেক্স, স্ফুলিঙ্গ, বিদ্যার্ঘ, সুবর্ণ জয়ন্তী টাওয়ার সহ অসংখ্যা স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কর্য রয়েছে। ৬ জুলাই দিনটাকে পালন করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকি দিবস হিসেবে।

প্রতিদিন ভোরের নতুন আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় ক্যাম্পাসের কর্ম চান্চল্যতা। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের প্রতিটা সফলতার গল্প যেন প্রমান করে সেই সকল মহানুভবতার দিশারীদের ত্যাগের সার্থকতা।যে আলোর মশাল তারা জ্বেলেছিলেন তা আজ সারা বিশ্বে দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

Share Button

৭ responses to “রাবির ইতিকথা—-শিরিনা আক্তার লিমা”

  1. Like!! I blog frequently and I really thank you for your content. The article has truly peaked my interest.

  2. Hi there, after reading this amazing paragraph i am as well delighted to share my knowledge here with friends.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ আপডেট

সম্পাদক ও প্রকাশক : এম. এম. শরীফুল আলম তুহিন
ইমেইল : expresstimes24@gmail.com
মোবাইল: ০১৭১২ ৭৪৭ ১৩৯ # ০১৯১৯ ৭৪৭ ১৩৯